কুলিয়ারচরে সরকারি জায়গা থেকে লক্ষ টাকার গাছ কাটার হিড়িক; নীরব ভূমিকায় প্রশাসন, ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী
মুহাম্মদ কাইসার হামিদ, কুলিয়ারচর (কিশোরগঞ্জ):
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে সরকারি রাস্তা ও জায়গা থেকে অবাধে লক্ষ লক্ষ টাকার মূল্যবান গাছ কেটে নেওয়ার উৎসব চলছে। মাত্র ৯ মাসের ব্যবধানে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে একের পর এক সরকারি গাছ চুরির ঘটনা ঘটলেও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। নামমাত্র অভিযোগের নাটক সাজিয়ে প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করার অভিযোগে স্থানীয় সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
বুধবার (১৯ আগস্ট) সকালে উপজেলার আগরপুর – ভাগলপুর রাস্তার রামদী বড়চর ফিডমিল সংলগ্ন এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, স্থানীয় হেলাল মুন্সির জমির সীমানা ঘেঁষে থাকা রাস্তা থেকে বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় এক লক্ষ টাকা মূল্যের কয়েকটি সরকারি গাছ কেটে মাঠিতে ফেলে রাখা হচ্ছে। এসময় কাটুরিয়াদের জিজ্ঞেস করা হলে তারা জানান পার্শ্ববর্তী মনোহরপুর গ্রামের শহিদুল গাছগুলো কাটতে তাদেরকে পাটিয়েছেন। তবে এসব গাছ বিক্রির সাথে কারা জড়িত তা বলতে পারেনি তারা।
বিষয়টি তাৎক্ষণিক উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. ইয়াসিন খন্দকার ও কুলিয়ারচর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কাজী আরিফ উদ্দীনকে অবহিত করার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে গাছ কাটতে ও নিয়ে যেতে বাধা দেওয়া হয়। এ বিষয়ে আইনগত কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. ইয়াসিন খন্দকার বলেন, তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের শুরুতে উপজেলার গোবরিয়া আবদুল্লাহপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের মাত্র ১০০ গজ দূরে সরকারি খাল ও রাস্তার পাশ থেকে একটি প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতায় ২০-২৫টি সরকারি গাছ কেটে বিক্রি করার গুরুতর অভিযোগ উঠে সদ্য বদলীকৃত গোবরিয়া আবদুল্লাহপুর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা নাছিমা আক্তার ও অফিস সহায়ক মো. রুকন উদ্দিনের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, এসব গাছ বিক্রির আনুমানিক ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর ঘটনা ধামাচাপা দিতে গত ১৫ জানুয়ারি কুলিয়ারচর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ১৮টি গাছ চুরির একটি লিখিত আবেদন জমা দেন নাছিমা আক্তার। তবে স্থানীয়দের দাবি, সেই অভিযোগ থানায় মামলা (এফআইআর) হিসেবে রেকর্ড হয়নি এবং কোনো তদন্তও করা হয়নি। ওই কাগজ দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে শান্ত রাখার অপচেষ্টা চালানো হয়। এর কিছুদিন পর একইভাবে আরও ৩টি গাছ বিক্রি করে ৮০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে তাদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায়ও রহস্যজনক কারনে আইনি কোন পদক্ষেপ নেননি তারা।
ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে গত ২৪ থেকে ২৬ জুলাই একই স্থান থেকে আরও তিনটি মূল্যবান গাছ কেটে নেওয়া হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা গাছ কাটার স্পষ্ট ভিডিও প্রমাণ উপজেলা প্রশাসন ও ভূমি কর্মকর্তাদের পাঠালেও অজ্ঞাত কারণে চিহ্নিত অপরাধীদের নাম বাদ দিয়ে গত ২৬ জুলাই পুনরায় থানায় অজ্ঞাতনামা আসামি করে দায়সারা অভিযোগ দেন নাছিমা আক্তার। গাছ কাটার ধারণকৃত ভিডিওতে শুনা গেছে কাটুরিয়ারা স্পষ্ট বলেছেন, মাসুদ নামে জৈনক এক ব্যক্তি তাদেরকে গাছ কাটতে পাঠিয়েছেন। তাই তারা গাছ কাটছেন।
গাছ কাটার সময় উপজেলা প্রশাসনকে অবহিত করার পর প্রথমে গাছগুলো কাটা বন্ধ করা হলেও এর কয়েকদিনপর অদৃশ্য ক্ষমতার দাপটে গাছগুলো নিয়ে গেলেও রহস্যজনক কারনে কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে কুলিয়ারচর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কাজী আরিফ উদ্দীন জানান, “সম্প্রতি বদলীকৃত গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা
নাছিমা আক্তার তার লিখিত অভিযোগে কোনো আসামির নাম উল্লেখ করেননি। পুলিশ আসামিদের নাম দিতে বললেও বাদী তা দেননি। বিষয়টি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে গত ১৬-১৭ নভেম্বর উপজেলার বাজরা মাছিমপুর এলাকায় সরকারি রাস্তা ও ঈদগাহ মাঠ থেকে শতবর্ষী জাম, আম ও রেন্টি গাছ কেটে এক লাখ ১৮ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় গত ১৭ নভেম্বর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন এলাকাবাসী। অভিযোগ দাখিলের পর সহকারী কমিশনার (ভূমি) মেফতাহুল হাসান পুলিশ ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে কাটা গাছ জব্দ করে স্থানীয় সালুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ কাইয়ুম এর জিম্মায় রেখে যান।
অভিযোগকারীরা জানান, বাজরা মাছিমপুর খেলার মাঠের পাশদিয়ে যাওয়া পুরনো সরকারি রেকর্ডভুক্ত রাস্তায় ও ঈদগাহ মাঠে রোপিত শতবর্ষী ১টি রেন্টি গাছ, ১টি আম গাছ, ১টি জাম গাছ কাউকে কোন কিছু না জানিয়ে প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া রাস্তা সংস্কারের নামে মাছিমপুর গ্রামের সিরাজুল ইসলাম, সাইফুল ইসলাম লিটন, নুরুল মনছুর টেনাম ও তানভীর আহম্মেদ গংরা গাছগুলো বিক্রি করে দেয়। তিনটি গাছের আনুমানিক মূল্য দুই লক্ষ টাকা হবে। গাছ বিক্রির পর গাছ ক্রয়কারী উপজেলার মনোহরপুর গ্রামের নূরুল ইসলামের ছেলে গাছ ব্যবসায়ী মো. ফুল মিয়া (৪৫) গাছগুলো কেটে নেওয়ার সময় সংবাদ পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে গাছ কাটতে ও নিয়ে যেতে বাধা দেয়।
এব্যাপারে মাছিমপুর গ্রামের মো. সাইফুল ইসলাম লিটন (৫০) সহ গাছ বিক্রির সাথে জড়িত ব্যক্তিরা গাছ বিক্রি করার কথা স্বীকার করে বলেন, আমাদের গ্রামবাসীর যাতায়াতের পূর্বের রাস্তাটি বন্ধ করে দেওয়ায়, নিরুপায় হয়ে বাজরা মাছিমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে যাওয়া রাস্তাটি ব্যবহারে উপযোগী করতে ও সরকারি ভাবে রাস্তা সংস্কারের জন্য একটি প্রজেক্ট পেতে রাস্তটি দৃশ্যমান করার প্রয়োজন হয়। সরকারি রেকর্ডভূক্ত ওই রাস্তা নির্মানের জন্য এলাকার মুরুব্বিদের সাথে পরামর্শ করে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যকে অবগত করে রাস্তার উপর থাকা একটি জাম গাছ ও ঈদগাহের সীমানায় থাকা একটি রেন্ট্রি গাছ ও একটি আম গাছ ১লাখ ১৮ হাজার টাকা মূল্য নির্ধারণ করে বিক্রি করি। পরে প্রশাসনের নির্দেশে গাছ কাটা ও নেওয়া বন্ধ রেখেছি।
এ ঘটনায় তারা তাদের ভুল স্বীকার করেন।
এছাড়াও গত ৭ ও ৮ মে বাজরা বাসস্ট্যান্ড হতে কামালপুর যাওয়ার রাস্তার মোড় থেকে একটি মূল্যবান রেনটি গাছ আশি শতাংশ কাটার পর স্থানীয়দের বাধার মুখে তা পণ্ড হয়ে যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ কুলিয়ারচর পৌরসভার সাবেক পৌর কমিশনার শহিদ মিয়া এ গাছটি কাটাচ্ছিলেন। শহিদ মিয়া গাছটি কাটার কথা স্বীকার করে বলেন, এ গাছটি তাদের সীমানায় তারা নিজরাই রোপন করেছিলেন। গাছের সীমানা ঘেষে যানবাহন যাতায়াতে ও দোকানদারদের সমস্যা হওয়ার কারনে তিনি গাছটি কাটাচ্ছিলেন।
সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসনের এমন উদাসীনতায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকার সচেতন নাগরিকেরা। তাদের দাবি, অভিযুক্ত ভূমি কর্মকর্তার শুধু বদলিই সমাধান হতে পারে না। ভিডিও ফুটেজ ও প্রত্যক্ষ প্রমাণের ভিত্তিতে জড়িত কর্মকর্তা ও মূল অপরাধীদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। অপর দিকে অন্যান্য সরকারি রাস্তা ও জায়গা থেকে যারা নিয়মবহির্ভূত ভাবে গাছ কেটে সরকারি সম্পদের ক্ষতি করেছে তাদেরও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
এসব বিষয়ে কুলিয়ারচর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. ইয়াসিন খন্দকার জানান, “নিয়মবহির্ভূতভাবে সরকারি সম্পত্তি থেকে গাছ কাটার সত্যতা পাওয়া গেলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত মামলা দায়েরসহ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তদন্ত কাজ চলছে।”



































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































