# Tags

শতকোটি টাকার মালিক সাবেক এমপি জাফর গ্রেফতার

মো.সাইফুল ইসলাম খোকন,চকরিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি-অবশেষে লুকিয়ে থেকেও বাঁচতে পারলো না চকরিয়া -পেকুয়ার ত্রাস সাবেক এমপি. জাফর আলম।
রাজধানীর ধানমন্ডি থেকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) সদস্যরা।
রোববার (২৭ এপ্রিল) বিকেলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) এই তথ্য জানাগেছে।
ফ্যাসিবাদ আওয়ামী লীগ সরকারের টানা সাড়ে ১৫ বছরে নিজস্ব বাহিনী সৃষ্টি করে এলাকায় একাই ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে কয়েক শ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক বনে যান, কক্সবাজারের চকরিয়া-পেকুয়া সংসদীয় আসনে জাফর আলম (৬৫)। বিগত ২০১৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হয়েছিলেন। এর আগে চকরিয়া পৌরসভার মেয়র ও চকরিয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ক্ষমতার দাপট ও বিএনপি- জামায়াতকে দমিয়ে রাখতে অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের দিয়ে নিজস্ব জাফর লীগ বাহিনী গঠন করে।
তাঁর অস্ত্রধারী বাহিনীর হাতে চকরিয়ার রাজপথে বিএনপি-জামায়াতের পাঁচজন কর্মী নিহত হয়েছে। এমনকি তাঁর বাহিনীর লুটপাট থেকে রক্ষা পায়নি গ্রামীণ ব্যাংকের ৩০০ একর বিশিষ্ট চিংড়িঘের ও।
বিশেষ করে জাফর আলম আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় সরকারে মেয়র, উপজেলা চেয়ারম্যান এবং এমপি হওয়ার সুযোগে এলাকার অঘোষিত শাসনকর্তায় পরিণত হন। তাঁর বেপরোয়া আচরণ ও বাহিনীদের ত্রাস সৃষ্টির কারণে এলাকায় কায়েম হয় ত্রাসের রাজত্ব ।
অভিযোগ রয়েছে, তাঁর নিজস্ব বাহিনী দিয়ে চকরিয়া-পেকুয়া উপজেলায় খুনখারাবি, সাধারণ মানুষের ও সরকারি জায়গাজমি দখল, গরুচুরি, মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানিসহ নানা অপকর্ম করে শত শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন এমপি জাফর আলম। শূন্য থেকে উঠে আসা জাফর মালিক হয়েছেন গাড়ি, বাড়ি, ফ্ল্যাট ও জমির।
একসময় অর্থসংকটে সংসার চালাতেও হিমশিম খাওয়া জাফর আলম বর্তমানে চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলা সদরে কয়েকটি শপিং কমপ্লেক্সসহ অনেক স্থাবর সম্পত্তির মালিক। নিয়োগ বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্য, পাহাড় ও নদীর অবৈধ বালু উত্তোলন, সরকারি বরাদ্দ লুট, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে মালিক বনেছেন অঢেল সম্পদের। এছাড়া চকরিয়া উপকূলীয় চিংড়ি জোনের অন্তত ১৫ হাজার একর ঘের ছিল তাঁর বাহিনীর দখলে।

এসবের সাথে তাঁর পিএস আমিন চৌধুরী, ভাতিজা জিয়াবুল হক ও ভাগিনা মিজান, ডুলাহাজারা ইউপি চেয়ারম্যান আদর, সাহারবিল ইউপি চেয়ারম্যান নবী হোসেন ও চিরিঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জামালসহ বেশ কিছু সন্ত্রাসীরা জড়িত ছিল।
কিন্তু নবী হোছন ও মিজান গ্রেফতার হলেও অনেকে রয়েছে অধরা।
তার অত্যচারের শিকার হাজার হাজার পরিবার আইন আদালতে দ্বারস্থ হয়ে কোন সুরহা পায়নি।
এমন কি এ জাফর আলম মৃতকে জীবিত দেখিয়ে চকরিয়া সাব রেজিস্ট্রি অফিসে জমি রেজিস্ট্রি করে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে অনেকের।

দাপটে জাফর আলম নিজের পাশাপাশি তার স্ত্রী, কন্যা, মেয়ে জামাই, ছেলে ও স্বনামে -বে নামে অনেক জমি,দোকান ঘরের মালিক হয়েছে । এখনো তার স্ত্রী রয়েছে রাজার হালে।
দৃশ্যমান হিসেবে পেকুয়া কবির আহমদ চৌধুরী বাজার সংলগ্ন বিশাল এলাকার জমি জোরজবরদস্তি করে দখলে নিয়ে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে শপিং কমপ্লেক্স। থানা রাস্তা মাথায় সিষ্টেম কমপ্লেক্স ও শাহেদা কমপ্লেক্স।
এছাড়া চকরিয়া পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ভরামুহুরী এলাকায় স্ত্রী শাহেদা বেগমের নামে বিশাল আয়তনের জমি কিনে দখল নিতে গিয়ে স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতা সোহেল খুন হন। এখনো পর্যন্ত সেই খুনের বিচার হয়নি।
ভুক্তভোগীরা জানায়, জাফর লীগের হাতে বিএনপি-জামায়াতের পাঁচ নেতাকর্মীই কেবল নিহত হননি, হামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তার দল আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী ও কয়েক জন সংবাদকমীও।
সুত্র জানায়, উপজেলার ডুলাহাজারা, চিরিঙ্গা ও সাহারবিল এলাকায় রয়েছে অন্তত ৩০০ সদস্যের কয়েকটি ডাকাতদল। এসব ডাকাতদলের নিয়ন্ত্রণও সাবেক এমপি জাফরের হাতে। সম্প্রতি ডুলাহাজারায় ডাকাত প্রতিরোধ করতে গিয়ে ছুরিকাঘাতে নিহত হন সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিম।

স্থানীয় অনেকের ধারণা, এই হতাকাণ্ডে জড়িত ডাকাতদলের পৃষ্ঠপোষক সাবেক এমপি জাফরের ডান হাত হিসেবে পরিচিত ডুলাহাজারা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আদর। এখনো আটক হইনি।

চিরিঙ্গা ইউনিয়নের সওদাগর ঘোনা নামের গ্রামটি সাবেক এমপি জাফরের একনিষ্ঠ সমর্থকদের বলে পরিচিত। সেই গ্রামেও রয়েছে শতাধিক ডাকাত। এসব ডাকাতের কাছে অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র থাকার বিষয়টি স্থানীয়রা অবহিত। এসব অস্ত্র উদ্ধার হয়নি রহস্য জনক কারণে।
এছাড়া এমপি জাফর আলমের দখলে নোবেলজয়ী প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংকের ৩০০ একরের আধুনিক পদ্ধতির চিংড়িঘের। ২০২১ সালে চকরিয়া উপকূলে গ্রামীণ চিংড়িঘেরটি জাফর বাহিনী দখল করে নিয়ে কয়েক কোটি টাকার মাছসহ অন্যান্য সম্পদ লুটপাট করে। গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গ্রামীণ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ দখলমুক্ত করে ঘেরটি। সে সময় বিষয়টি নিয়ে চকরিয়া থানায় মামলা হলেও ক্ষমতার দাপটের কারণে মামলায় জাফর আলমের লোকজনকে আসামি করা সম্ভব হয়নি বলে নিশ্চিত করেন, গ্রামীণ ব্যাংকের চিংডি ব্যবস্থাপক উৎপল কান্তি চৌধুরী।

জানা যায়, জাফর আলমের অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তাধীন। জাফর আলমের বিরুদ্ধে খুন-ডাকাতিসহ ডজনখানেক মামলাও রয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, চকরিয়া- পেকুয়া উপজেলার ভয়ংকর সব অপরাধের সঙ্গে জড়িত সাবেক এমপি জাফর। গত বছরের ১৫ আগস্ট জামায়াত নেতা সাঈদীর গায়েবানা জানাজা থেকে ফেরার পথে মুসল্লিদের ওপর জাফর আলমের নেতৃত্বে গুলিবর্ষণ করা হয়। এ সময় ফোরকান নামের এক ব্যক্তি নিহত হন। গত ৩ ও ৪ আগস্ট তাঁর নেতৃত্বে চকরিয়া পৌর শহরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মিছিলে গুলিবর্ষণ করা হয়। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালালে তিনিও আত্মগোপনে চলে যান। কিন্তু তাঁর গাঢাকা বাহিনীর লোকজন এখন বিভিন্ন স্থানে দলবদ্ধ ভাবে বিভিন্ন অপরাধ করে যাচ্ছে।
৫ আগস্ট বিক্ষুব্ধ জনতা চিরিঙ্গা স্টেশনে জাফর আলমের মালিকানাধীন মার্কেট সিস্টেম প্লাজায় অগ্নিসংযোগ করে।
তিনি ঢাকায় গ্রেফতারের খবরে একদিকে আনন্দ অপরদিকে তার বাহিনী কতৃক আক্রমনের আতংকে রয়েছে বিভিন্ন লোকজন। ##